দেবী প্রসঙ্গে

12238359_10153327965626973_4755189591216612547_oমাথায় গুরুভার মুকুট- কিংবা হালফ্যাশনের বস্ত্রনিপাট- দেবী। কি করে, কে বানায়, আর কে হয়- কি পাপে কিংবা পাপের প্রায়শ্চিত্তে।

ভালবেসে মালা পড়ালে যদি- দেবী সে, কখনো বেশ্যা নয়। কখনো খেলাপী নয়- অথচ প্রস্তরের পাল্পলিপি জানে অন্তরীয় সংশয়।

এন্তার গীতিকাব্য হল লেখা। গল্প-গান-ভালবাসার উতকৃষ্টতম অর্ঘ্য অর্পিত হল যে পায়ে- তার নখরে লুকিয়ে থাকা সবুজ শ্যাওলা; যে মালা জড়ালে বাহু বেঁধে গলে গলে, সে কন্ঠের ফাঁস, থাকল অলখেই।

দেবীরা বড় শূণ্যে শূণ্যে চলে,

পায়ের পাতা ছোঁয় না মাটি মোটে

দেবীরা বড্ড বেছে বেছে কথা বলে

পাছে বদ লোকে কথাটা পেঁচিয়ে ফ্যালে!

পৃথিবীর চির-রহস্যের আধার- দেবী।

এই ললাট-লিখন খন্ডায় সাধ্য কার?

দূর্গ বিনা অচল সে নন্দিনী

প্রাচীরে ফাটল ধরাবে রাজকুমার!

 

হ্যাঁ, দেবীরা খুবই উদ্ধারকামী। স্বয়ম্ভূ হলেও তার বাহন চাই, হাতিয়ার প্রস্তুত থাকলেও তার শ্রমীক আবশ্যক। আর খুব করে, খুব-খুব করে, আরাধনা চাই!

দেবীরা খুব আরাধ্য না হলে প’রে

পুরোহিতেরা সব পেটে-ভাতে মরে

গল্প-কেচ্ছা-দালানের গা খসে-খসে

ইতিহাস-গড়া প্রতীমাটি ভেঙে পড়ে

ভূমিষ্ঠ হতে না হতেই তাই দেবী

গায়ে পরে নেয় পুরাণের আলোয়ান

চোখে এঁটে নিয়ে সাদা-কালো শ্রেণী-চশমা

ডানা দু’টো কেটে গার্বেজ ক্যানে ফ্যালে।

 

আসবে পতিত-পাবন, দেবী জানে। আসবে ত্রাতা, আসবে শ্রোতা, রাজা ও ভিখারি, দেব ও দানো।

 

অথচ আমরা দেখি, হাওয়ার ঝড়ে-মেঘে তার একটি পালকও উন্মীলিত হয় না।

 

দেবীদের জাগরূক হতে নেই।

 

 

 

The Dancer and the Snake (নৃত্যের বহির্ভূত সাপ)

নৃত্যের বহির্ভূত সাপ কেন্দ্রে ফণা তোলে;
বিষ জেনেও নওল নর্তকী
নাচের ঘেরে ফোটায় নতুন ফুল-
তার অক্লান্ত ঘূর্ণিতে বাঁচে যে অক্ষয় বট
পাতার আওয়াজে তার সাপটি পুনরায় বিচলিত হয়ে পড়ে:
অথচ-
পলাতক বাজের নখর আজ তারই মুখে অভিন্ন অসংশয়;
পরিধি থেকে কেন্দ্রে একাগ্র গতি, নাচে পড়লেও
পড়তে পারে যতি-
সতর্ক জিভে খোঁজে হাওয়ার ইঙ্গিত
———-

কবি ও কবিতা

‘কবি হওয়া’টা আসলে কি জিনিস?

প্রশ্নটা অনেকদিন যাবত মাথায় ঘুরপাক খায়, এবং রিটন খান ভাই যখন কবি-সংক্রান্ত একটি পোস্ট দেন ‘বইয়ের হাট’-এ তখন কিছু কথা দানা বেধে যা দাঁড়ায় তা হল এই-

অনেকেই বলেন কবিতা লেখার পাশাপাশি অন্য কিছু করলে সে নাকি আর ‘কবি’ পদভুক্ত থাকে না, কবি মানে ‘শুদ্ধ-কবি’, যিনি কবিতায় বাঁচবেন-খাবেন-মরবেন। অথচ আমরা দেখতে পাই অনেক শিল্পীই তাদের জীবন শুরু করেন কবিতা দিয়ে, অসাধারণ কাজও করে যান কাব্য-শিল্পে, কিন্তু কবিতা হয়ত শেষমেষ তাদের শিল্পীজীবনের মধ্যমণি হয় না, অন্য কোন শিল্পমাধ্যমে তাদের কাজের অনুষঙ্গ হয়ে যায় (উল্লেখ্য জ্যঁ ককতো, আব্বাস কিয়ারোস্তামি)। অতঃপর লোকজনে তাকে আর ‘কবি’ হিসেবে দেখতে/ভাবতে প্রস্তুত থাকেন না। অথচ তিনি হয়ত মনে-প্রাণে একজন কবি-ই, তার চিন্তা-প্রক্রিয়া জগতের, মানুষের, প্রকৃতির গভীরতর সম্পর্কগুলো উদঘাটনেই তৎপর।

এরকম দেখা ও জানার পর আমার মনে হয় যে, ‘কবি’ হওয়াটা আসলে আদতে কেবল একটা লাইফস্টাইল নয়, প্রতিদিন রুটিনমাফিক দুই-চার লাইন প্রসব করে যাওয়াও নয়। এটা হতে পারে একজন মানুষের বাচার/চিন্তার/বুঝবার/বোঝাবার একটা পদ্ধতি, যেটা আসলে তার কাজেই (সেটা যে মাধ্যমেই হোক না কেন) সদা-প্রকাশমান থাকে।

উক্ত ভাবনাগুলো নিতান্তই ব্যক্তিগত। ইদানিং কবি/কবিতাকে নানা সংকীর্ণ ধারণায় আবদ্ধকরণের একটা চেষ্টা দেখি আশেপাশে, তার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ এই চিন্তাগুলো মাথায় কাজ করে।

দশটি কবিতা (সূনৃত-তে প্রকাশিত)

আলোকপাত

অযথা জলাশয়ে ঢেউ কিংবাjanala
সাগরে থিরতা খুঁজে
থিতু হলে নিঃসীম প্রাকৃত অন্ধকারে-
রৌদ্রের বিপরীতে দুষলে কালঝড় আর
সবুজ ঘাসের বিপরীতে দাবানল।
এ খেলা চলতে পারে অবধিহীন।

ক্ষুধার চেয়েও সহজাত এ বৈপরত্য,
পরমানুর আবেগে সিঞ্চিত যে অস্থিরতা
ঘোচাবে কি করে এলোপাথারে মাথা ঠুকে।
কাল তাই তাকাবে সুদূরে।
যে প্রস্তর-লিখন চেছে তুলেছিলে দেবতার প্রণোদনায়
অস্পষ্ট রেখায় তার বোলাবে করুণ হাসি,
আলোকপাতে-
মানুষের নয় হবার শান্তি-পারঙ্গম।

 

নিঝুম দ্বীপ

এমন দৃশ্য কেউ দেখেনি কখনও।
ওষ্ঠাধরের বিচ্ছেদ স্পষ্ট
সমুখে স্বর্গ, চোখে লাগে ঘোর
সভ্যতার ইতিহাস থমকে দাঁড়ায় এখানে Continue reading “দশটি কবিতা (সূনৃত-তে প্রকাশিত)”

পরশ-পাথর

আমি পরশ-পাথর, স্পর্শে নিত্য স্বর্ণ ফলাই।
আমার ছায়ায়-আশ্রয় ধুলিকণাও হয়
মোক্ষম ধাতু, অক্ষয় প্রাণে বলিয়ান-

স্বর্ণ হয়ে পরে চলে যায় সব,
বিকাল ফুরালে সন্ধ্যা নিরব-
আমি পরশ-পাথর, অনাদিকাল ধরে
যে কেবল পাথরই থেকে যায়।

 

ঢাকা, ৫.০১.’১৬

এটি কোন কবিতা নয়/ This Is Not A Poem

(এটা যখন লিখি প্রতিকবিতার নামটাও জানা ছিল না। তবে এটা সে অর্থে হয়ত প্রতিকবিতা নয়ও। নামটা তবুও অন্যথা বলে। প্রথমে ইংরেজিতে লেখা হয়েছিল। পরে কি ভেবে বাংলা করে ফেলি দ্রুত।)

এটি কোন কবিতা নয়। তবু কাব্য আমাকে স্মরণ করে এ প্রলাপ লেখার ক্ষণে। এবং তা লিখিত হয় আমার শোণিতে। আমি শুধু সাবধানে, খুব সাবধানে আমার মাথার সামনটা চিরে ফেলি। Continue reading “এটি কোন কবিতা নয়/ This Is Not A Poem”

স্ফুলিঙ্গ চতুষ্টয়


কিন্তু তারপর সব ঘাস হয়ে গেল
ঘ্যাসঘ্যাসে লোহা, আর তামাদি ফোস্কাবৎ আধান্যাংটা ঘোড়া —
সোজাসাপ্টা আলোয় তা বেমালুম উদয় হলো —
যদিও ততটা নির্ভার স্বর্ণপ্রভায় নয়, যেমনটা তুমি চেয়েছিলে,
নিছক এক তাপ—বৈদ্যুতিক খেলাচ্ছলে
উড়ে গেল শতদলে মৃতপাখা তুরন্ত শেল, বিনা লক্ষ্যভেদে।

বিনামেঘে বজ্রপাত, ঘাস থেকে বেরোল হঠাৎ শ্বেতশুভ্র ডিম —
হয়তো-বা থাকলে থাকতেও পারে নবোপলব্ধির সুরভিত কুসুম।


আমাদের হুটোপুটি, যন্ত্রণা,
ফ্যাঁসফোঁস, ক্যাঁচক্যাঁচ, প্যাঁকপ্যাঁক —
সব এক-লহমায় গপ করে গিলে নিয়ে
তিমিটা হারিয়ে গিয়ে কৃষ্ণগহ্বরে
কে জানে ফের উদয় হবে কোন মৃত সাগরের বুকে,
উগড়ে দিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড হাপুস জলোচ্ছ্বাসে।

সেখানে লুটোপুটি, ঘোঁতঘোঁত লারেলাপ্পা নিয়ে বয়ে যাবে
নীহারিকা যেন অঝোর স্মিত বেদুইন;
ধড়মুণ্ডহীন আবহমান অজগর।


ভোর এগিয়ে আসে
ভোরের মদালস বক্ষ চিরে উঁকি দেয়
কালোবিবর —
ভোরের শরীর বেয়ে নিকষ রক্তের ধারা  —
আচমকা মেঘ, ভাস্কর্যের ছাই-মুখ
ঝলসে ওঠে ছুরিকা-হাতে।

লাইটপোস্টগুলো ঠোঁটে তর্জনী চেপে
হলুদে-ভেজা ভ্যানগাড়িগুলোকে শাসালে
কড়কড়ে বিদঘুটে আওয়াজে
দিগন্ত আলোকিত করে ডাকে
একটা রূপালি সাইরেন
তার ধবল শব্দে শিরা-উপশিরা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট —
উহ্, কী পোড়া গন্ধ
রক্তাক্ত লাল ফুলের গুচ্ছ হয়ে
মাটিতে সজোরে আছড়ে পড়ে
ছুরিকাহত ভোর।

তারপর অসীম বিস্ফোরণের বিচ্ছুরণে
আমাদের আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।


বর্ষণের ভেতরে যে ক্ষোভ লুকিয়ে আছে
তাকে মুষ্টিবদ্ধ করো —
খাপখোলা তরবারির মতো বেজে উঠুক
তার হিমনাদ, পঙ্কিল পিপাসার
ভেতর সে সাড়া দিক,
ছিটকে বেরিয়ে আসুক, ফিরিয়ে দিক
আভা অধিকৃতদের নিভন্ত স্বরে

তাকে জাপ্টে ধরো,
ছুটে যেতে যেতে খামচে ধরো তার
আস্তিন, টুঁটি চেপে ধরো তার,
জোর আলিঙ্গন করো, বুকে পিষে
শুষে নাও তার অস্থির তরঙ্গাদি —
হরেক রঙের বেহায়াপনা তার চূর্ণ করো

যতক্ষণ না
যতক্ষণ না তার
সমস্ত ভাষাটুকু ফিরে পেয়েছ,
উপলব্ধি করেছ তার সংহারি বর্ণমালা

বর্ষণের ভেতরে যে ক্ষোভ ঘুমিয়ে আছে
তাকে ভালবাসো, আত্মস্থ করো আবার
পুনর্জন্ম নাও, তার আত্মজা হয়ে।

———