আমার শহীদুল জহির পাঠ: জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

jibon

শহীদুল জহির—বাংলা সাহিত্যের এই জাদুকরের নাম আমার কাছে নবতম প্রেমের সমার্থক হয়ে ওঠে যেদিন ই-বই এ, কম্পিউটারের পর্দায় ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’র প্রথম বাক্যটি দৃষ্টিগোচর হয়—‘উনিশ শ পঁচাশি সনে একদিন লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনের যুবক আবদুল মজিদের পায়ের স্যাণ্ডেল পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি বিধানে ব্যর্থ হয়ে ফট করে ছিঁড়ে যায়’। এই লাইনটির মধ্যে প্রথমেই যা নজরে পড়ে, বা বলা যায় এক ধাক্কায় যে ভঙ্গিমাটি এটি তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়, তা একটি নির্দিষ্ট গদ্যরীতি, যার সাথে প্রবন্ধের বাক্যগঠনের আমরা একটি সম্পৃক্ততা দেখতে পাই। মনে হয় লেখক যেন এই জগতের, যে জগতটি তিনি বুনে চলেছেন, তার দূরতর কোন দ্রষ্টা, যেন অন্য কোথাও পড়া কিছু গল্পের আখ্যান তিনি লিখে চলেন, যে গল্পগুলো সম্পর্কে তার নিজস্ব বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ আছে।কেন আবদুল মজিদের পায়ের স্যান্ডেল ছিঁড়ে যায় তার সন্ধান করতে উৎসুক পাঠক এগোলে জানতে পায়, ‘আসলে বস্তুর প্রাণতত্ত্ব যদি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে হয়তো বলা যেত যে, তার ডান পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ফিতে বস্তুর ব্যর্থতার জন্য নয়, বরং প্রাণের অন্তর্গত সেই কারণে ছিন্ন হয়, যে কারণে এর একটু পর আবদুল মজিদের অস্তিত্ব পুনর্বার ভেঙে পড়তে চায়’। দ্বিতীয় লাইনে এসে শহীদুলের বিজ্ঞানমনস্কতার সাথে আমরা পরিচিত হই, যেখানে তিনি মানুষের মানসিক বাস্তবতার সাথে বস্তুজগতের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে নিজের আস্থায় আলোকপাত করেন।

Continue reading “আমার শহীদুল জহির পাঠ: জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা”

Advertisements

গোর্কির ‘মা’- একবিংশ শতাব্দীর পাঠ

অবশেষে ‘মা’ শেষ করলাম।

পুষ্পময়ী বসুকে প্রণাম, তার কারণেই বইটা যথাযোগ্য ভাবে উপভোগ করা গেল।  এত প্রাঞ্জল, সৃজনশীল আর আন্তরিক অনুবাদ ইহজীবনে পড়েছি বলে মনে পড়ে না। ভদ্রমহিলা মন-প্রাণ ঢেলে অনুবাদটি করেছিলেন, বোঝাই যায়।

একবিংশ শতাব্দীতে ‘মা’ এর পাঠ নি:সন্দেহে অন্যতর হবে। মা এমন সময়ে গোর্কি লিখেছিলেন যখন সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন সাধারণের মনে দানা বাধছে। মানুষের মাঝে সমতার বিধানের মাধ্যমে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে মশগুল এক দল তাজা তরুণ প্রাণ, যাদের আহবায়ক ও নেতৃত্বপ্রদানকারী স্বত্বা পাভেল, উপান্যাসের শিরোনাম্নী চরিত্র পাভেলেরই মা। প্রাথমিকভাবে ধর্মভীরু, কোমল মা নিজের অজান্তেই ধীরে ধীরে মিশে যায় ছেলের মিশনের সাথে, সত্য ও ন্যায়ের এক পৃথিবী প্রতিষ্ঠার কর্মযজ্ঞে। ওদের চোখের জ্বলে ওঠা আগুনের সাথে একাত্মা হয়ে ওঠে মা, শুরু হয় তার নতুন জীবন।

Continue reading “গোর্কির ‘মা’- একবিংশ শতাব্দীর পাঠ”

রাসকোলনিকভ ও আমি

‘অপরাধ ও শাস্তি’- যেকোন সাহিত্যানুরাগীর কৈশোর-তারুণ্যের অবশ্য-পাঠ্য একটা বই। স্বভাবসিদ্ধ নিয়ম-বিরাগের কারণেই অবশ্য-পাঠ্য, অবশ্য-দেখনীয় জিনিসগুলো আস্বাদন করা হয় আমার দেরিতে। সে যা-ই হোক, দস্তয়ভস্কি সম্পর্কে এতদিন শুনে এসেছি, কিন্তু কেউ কোনদিন বলেনি (ইদানিং অনু ভাই ছাড়া) আগে কেন এই লোকের এত খ্যাতি, কোথায় তার কৃতিত্ব। ‘অপরাধ ও শাস্তি’ পড়ার পর যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তারই খানিকটা (পুরোটা করা সম্ভব না, প্রতি মুহূর্তের এত চমক লেখার সময় বা স্থান সংকুলান কি করে করি?) এখানে লিপিবদ্ধ করতে চাই।

‘অপরাধ ও শাস্তি’ এক আধুনিক শিক্ষিত দরিদ্র যুবার বিভ্রান্ত, তত্ত্ব-ভারাক্রান্ত মনের গতিবিধির সুচারু বিশ্লেষণ। সুচারু না বলে আরও ভাল হয় পুঙ্খানুপুঙ্খ বললে। দস্তয়ভস্কির বাচন ও বিশ্লেষণভংগি, পাঠক মাত্রেই জানেন, এত গভীর যে সময়ে সময়ে পিলে চমকে ওঠে; রাসকোলনিকভ ও অন্যান্য চরিত্রগুলোকেও এত জীবন্ত, তাদের মনের প্রতিটি ভঙ্গিমা এত নিখুঁত ও রক্ত-মাংসের রূপে উঠে আসে যে শিউরে উঠতে হয়। আর এখানেই লেখকের কৃতিত্ব। Dostoyevsky gets under your skin- ইলেক্ট্রনের গতিময়তায় যে সূক্ষ্ম-জটিল ভাবনাগুলো আমাদের মনে উপলব্ধির অবতরণ হবার আগেই হানা দিয়ে নিমেষে সরে যায়- সেই অধরা প্রতিটি অনুভূতি ও অসমাপ্ত কথা-বাক্যকে ধরে ধরে শৈল্য-চিকিতসকের মত নিপুণ হাতে কাটাছেড়া করেন ফিয়োদর। আর ছুরির প্রতিটি পোঁচে যেন রাঙিয়ে ওঠে পাঠকের মন।

Continue reading “রাসকোলনিকভ ও আমি”