আমার শহীদুল জহির পাঠ: জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

jibon

শহীদুল জহির—বাংলা সাহিত্যের এই জাদুকরের নাম আমার কাছে নবতম প্রেমের সমার্থক হয়ে ওঠে যেদিন ই-বই এ, কম্পিউটারের পর্দায় ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’র প্রথম বাক্যটি দৃষ্টিগোচর হয়—‘উনিশ শ পঁচাশি সনে একদিন লক্ষ্মীবাজারের শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরী লেনের যুবক আবদুল মজিদের পায়ের স্যাণ্ডেল পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি বিধানে ব্যর্থ হয়ে ফট করে ছিঁড়ে যায়’। এই লাইনটির মধ্যে প্রথমেই যা নজরে পড়ে, বা বলা যায় এক ধাক্কায় যে ভঙ্গিমাটি এটি তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়, তা একটি নির্দিষ্ট গদ্যরীতি, যার সাথে প্রবন্ধের বাক্যগঠনের আমরা একটি সম্পৃক্ততা দেখতে পাই। মনে হয় লেখক যেন এই জগতের, যে জগতটি তিনি বুনে চলেছেন, তার দূরতর কোন দ্রষ্টা, যেন অন্য কোথাও পড়া কিছু গল্পের আখ্যান তিনি লিখে চলেন, যে গল্পগুলো সম্পর্কে তার নিজস্ব বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। কেন আবদুল মজিদের পায়ের স্যান্ডেল ছিঁড়ে যায় তার সন্ধান করতে উৎসুক পাঠক এগোলে জানতে পায়, ‘আসলে বস্তুর প্রাণতত্ত্ব যদি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতো, তাহলে হয়তো বলা যেত যে, তার ডান পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ফিতে বস্তুর ব্যর্থতার জন্য নয়, বরং প্রাণের অন্তর্গত সেই কারণে ছিন্ন হয়, যে কারণে এর একটু পর আবদুল মজিদের অস্তিত্ব পুনর্বার ভেঙে পড়তে চায়’। দ্বিতীয় লাইনে এসে শহীদুলের বিজ্ঞানমনস্কতার সাথে আমরা পরিচিত হই, যেখানে তিনি মানুষের মানসিক বাস্তবতার সাথে বস্তুজগতের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে নিজের আস্থায় আলোকপাত করেন।

‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ শহীদুল জহিরের প্রথম উপন্যাস, দ্বিতীয় প্রকাশিত গ্রন্থ। এটি লিখবার আগে লেখক প্রথম জাদুবাস্তবতার ঘরানার সাথে পরিচিত হন, তার ভাষ্যমতে তার প্রথম পড়া ম্যাজিক রিয়েলিজম ভিত্তিক উপন্যাস ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ এর পাঠের মাধ্যমে। শহীদুল জহিরকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের জাদুবাস্তবতার পুরোধার, যদিও তিনি নিজে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর লেখায় এর আলামত আগে দেখতে পান বলে ব্যক্ত করেন। প্রথম উপন্যাসেই তিনি এই গল্পশৈলি এমন সাফল্যের সাথে প্রয়োগ করেন যে আমরা রয়ে যাই হতবিহ্বল। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে সাহিত্যচর্চা করে আসা শহীদুল জহিরের পক্ষে হয়ত এ অতিবাস্তব কিছু মোটেই না।

আমাদের দেশের রাজনীতিকদের ধারণা ছিল, এবং এখনো আছে— ‘রাজনীতিতে চিরদিনের বন্ধু অথবা চিরদিনের শত্রু বলে কিছু নেই। কাজেই অতীত ভুলে যাওয়া ছাড়া কি-ই বা করার থাকে মানুষের’…

শহীদুলের প্রথম বই, একটি ছোটগল্পের সংকলন ‘পারাপার’ এর সাথে যদি আমরা পরিচিত থাকি তবে বুঝতে পারা যায় এই ‘লম্ফের’ দূরত্ব। ‘পারাপার’, লেখকের নিজের বয়ানেই একটি নির্দিষ্ট ভাবাদর্শের চেতনা-প্রসূত গ্রন্থ। মার্ক্সবাদী রাজনীতিতে অল্প-বিস্তর হাতেখড়ি হওয়া শহীদুল তখনো বিশ্বাস করতেন মানুষের ও জীবনের জয়ে, গল্পশৈলীতেও তাই তখন রয়ে যায় যথোপযুক্ত বাস্তবতার প্রভাব, চরিত্রগুলো বেশিরভাগ হয় নিম্ন-বিত্ত খেটে-খাওয়া শ্রেণীভুক্ত মানুষেরা। ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’য়, যা কি না ১৯৭১/ ১৯৮৫ সনের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লিখিত, এই পরিচিত চিন্তাধারা থেকে শহীদুল সরে আসেন। ক্ষণজন্মা এই লেখকের হাতে রচিত হয় ‘পরাজয়ের’ এমন এক আখ্যান যার জন্ম একমাত্র বাংলাদেশ নামের এই ভূখন্ডেই সম্ভব হয়।

গল্পটা আবদুল মজিদ ও বদরুদ্দিন মওলানাদের। গল্পটা এক ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’র যার সমাপ্তি ঘটে গল্পের গন্ডিতে করুণ পরিণতির ভেতর। ১৯৮৫ এর লক্ষ্মীবাজারের পটভূমিতে এই কাহিনীর শুরু যখন বদরুদ্দিন মওলানার ছেলে, রাজাকার-পুত্র, আবুল খায়েরের উচ্চকিত কন্ঠ লাউডস্পিকারে ধ্বনিত হলে আবদুল মজিদের স্যান্ডেল ছিঁড়ে যায়, যা তার হৃদয়ের তন্তু বিচ্ছিন্ন হবারই সমার্থক। পৃষ্ঠা না উল্টাতেই আমরা প্রবিষ্ট হই ১৯৭১ সালের লক্ষ্মীবাজারে, যখন বদরুদ্দিন মওলানারা আনন্দের সহিত কাটা মাংসের টুকরা আকাশে ছিটিয়ে কাকদের সাদরে আমন্ত্রণ জানাত, যে কাকেরা এখন তার পুত্রের আলখাল্লা থেকে দলে দলে বের হয় বলে মজিদের কাছে প্রতিভাত হয়।

বদরুদ্দিন মওলানাদের নৃশংসতার কাহিনী আমরা জানি নানাভাবেই, কিন্তু শহীদুল জহির ভাষা ও শৈলীর অভিনব প্রয়োগে যে বাস্তবতা রচনা করেন তা যে কোন জাদুবাস্তবতাকে ছাড়িয়ে যায়, নাটকীয় হয়েও এড়িয়ে যায় অতি-নাটকিয়তা অদ্ভুত কৌশলে। অবশ্য ’৭১ এর প্রেক্ষাপটে রচিত কোন গল্পই যথেষ্ট নাটকীয় হতে পারে না। যে পুনর্কথনের মাধ্যমে শহীদুল দুই সময়ের (মোটা দাগে) এবং বিভিন্ন ঘটনাগুলোর মধ্যকার সময়কালের সম্পর্ক ও পারস্পরিক ব্যঞ্জনা দক্ষতার সাথে রক্ষা করেন, তা কথন-শৈলী হিসেবে বোধ করি একান্তই তার নিজস্ব। এই শৈলীতে সাযুজ্য রক্ষা করতে অনিবার্যভাবে কিছু রেফারেন্স পয়েন্টের প্রয়োজন হয়— আবদুল মজিদের জুতা ছেঁড়া, তার বোন মোমেনার পরিণতি, বদু মওলানা ও পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের সম্পর্ক, আজিজ পাঠান— এরকমই কয়েকটি ঘটনা/চরিত্র যেগুলো গল্প বলায় ক্রমে ঘুরে ঘুরে আসে এবং ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়, যার আভাস আমরা উপন্যাসের শুরু থেকেই পেয়ে আসি।

শহীদুল জহিরের লেখনীর যে অন্যতম বৈশিষ্ট্য তা হল গল্পকথনের এক সম্পূর্ণ নতুন ভঙ্গিমা, যাকে আমরা বর্ণনা করতে পারি এক ‘যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি’ হিসেবে। কথনশৈলীর এই রূপে মহল্লার মানুষ, গ্রামের লোকেরা সমষ্টিগতভাবে হয়ে ওঠে মূল/গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তাদের মুখ থেকে খসে পড়া কান-কথা/গুজবকে লেখক সাগ্রহে গ্রহণ করেন, এবং তাদের যুগপৎ বয়ানে সত্য ও মিথ্যার ভেদাভেদগুলো ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আলোচ্য উপন্যাসে মহল্লার লোকেরা শুধু এককভাবে মতামত পোষণ ও ব্যক্তই করে না, তাদের ক্রিয়াকর্মও হয়ে ওঠে অভিন্ন। পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে নিহত ব্যক্তিদের তারা একসাথে দাফন করে, একসাথে গোপনে শোক-পালন করে। তারাই একসাথে যুদ্ধ শেষে কবরস্থান থেকে ছিন্ন মস্তকসমূহ উদ্ধার করে এবং তারাই ত একত্রে প্রিয় স্ত্রী-কন্যাদের মুরগীর মত উর্ধ্বশ্বাস ছোটাছুটি দেখে ‘বলাৎকারের’ অর্থ অনুধাবন করে। তারা একত্রে আজিজ পাঠানের যুদ্ধে গমন, বাড়িতে লুটপাট, ও তার ফিরে আসা অবলোকন করে। তারাই স্বাধীনতার দু’ বছরের মধ্যে বদু মওলানাদের ফিরে আসার সাক্ষী থাকে এবং তাদের কেউ কেউ, আবদুল মজিদ সহ, একদিন কাকদের মানুষের মাংস খিলানো বদু মওলানাকে লাউডস্পিকারে ভাষণরত অবস্থায় দেখার সৌভাগ্যও অর্জন করে!

হ্যাঁ, বদু মওলানারা মরল না। কারণ, শহীদুলের ভাষ্যমতে একাত্তরের পর স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বিভিন্নভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলেও ‘সত্যিকার অর্থে ছত্রভঙ্গ হল না তারা যারা যুদ্ধের বিরোধিতা করল’। কারণ আমাদের দেশের রাজনীতিকদের ধারণা ছিল, এবং এখনো আছে— ‘রাজনীতিতে চিরদিনের বন্ধু অথবা চিরদিনের শত্রু বলে কিছু নেই। কাজেই অতীত ভুলে যাওয়া ছাড়া কি-ই বা করার থাকে মানুষের’। এই বইটি যে সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখা তখন স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে, এর বিভিন্ন প্রবাহের সাথে তখন এসে মিশেছিল তারাও যারা এই দেশটারই অস্তিত্বের বিরোধিতা করেছিল। পুনর্বাসিত এই সব প্রেতদের দেখে ঘৃণায় কুকড়ে উঠেছিল আবদুল মজিদের মত যুদ্ধ-পর্যুদস্ত মানুষেরা, এবং এই ঘৃণাই হয়ে উঠেছিল তাদের কাল।

মুক্তিযুদ্ধ শহীদুল জহিরের লেখায় বারং বার ফিরে আসে। কখনো সশরীরে যুদ্ধে না যাওয়া শহীদুল কি চাপা অপরাধবোধে ভুগতেন? যদিও তিনি সে সম্ভাবনা প্রকাশ্যেই নাকচ করে দেন, আমরা দেখি মুক্তিযুদ্ধ বার-বার আসে জ্বলন্ত ভাবে, আর জিঞ্জিরায় লেখকের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতাও একাধিক বার আমরা তার লেখায় উঠে আসতে দেখি। আজ অকাল-প্রয়াত এই লেখক বেঁচে থাকলে রাজাকারদের ফাঁসি দেখে নিশ্চিত খুশি হতেন একাধারে। প্রশ্ন জাগে, অন্যদিকে অভিজিৎ রায়-অনন্ত বিজয় দাশের মতন তরুণ প্রাণদের একই আততায়ীদের হাতে ঝরে যেতে দেখলে তিনি কি বলতেন? হয়ত তখন তার হাত দিয়ে বেরিয়ে আসত আর কোন অজর আখ্যান, যার শেষ আপাতদৃষ্টে গোচর হয় না।

 

দেবী প্রসঙ্গে

12238359_10153327965626973_4755189591216612547_oমাথায় গুরুভার মুকুট- কিংবা হালফ্যাশনের বস্ত্রনিপাট- দেবী। কি করে, কে বানায়, আর কে হয়- কি পাপে কিংবা পাপের প্রায়শ্চিত্তে।

ভালবেসে মালা পড়ালে যদি- দেবী সে, কখনো বেশ্যা নয়। কখনো খেলাপী নয়- অথচ প্রস্তরের পাল্পলিপি জানে অন্তরীয় সংশয়।

এন্তার গীতিকাব্য হল লেখা। গল্প-গান-ভালবাসার উতকৃষ্টতম অর্ঘ্য অর্পিত হল যে পায়ে- তার নখরে লুকিয়ে থাকা সবুজ শ্যাওলা; যে মালা জড়ালে বাহু বেঁধে গলে গলে, সে কন্ঠের ফাঁস, থাকল অলখেই।

দেবীরা বড় শূণ্যে শূণ্যে চলে,

পায়ের পাতা ছোঁয় না মাটি মোটে

দেবীরা বড্ড বেছে বেছে কথা বলে

পাছে বদ লোকে কথাটা পেঁচিয়ে ফ্যালে!

পৃথিবীর চির-রহস্যের আধার- দেবী।

এই ললাট-লিখন খন্ডায় সাধ্য কার?

দূর্গ বিনা অচল সে নন্দিনী

প্রাচীরে ফাটল ধরাবে রাজকুমার!

 

হ্যাঁ, দেবীরা খুবই উদ্ধারকামী। স্বয়ম্ভূ হলেও তার বাহন চাই, হাতিয়ার প্রস্তুত থাকলেও তার শ্রমীক আবশ্যক। আর খুব করে, খুব-খুব করে, আরাধনা চাই!

দেবীরা খুব আরাধ্য না হলে প’রে

পুরোহিতেরা সব পেটে-ভাতে মরে

গল্প-কেচ্ছা-দালানের গা খসে-খসে

ইতিহাস-গড়া প্রতীমাটি ভেঙে পড়ে

ভূমিষ্ঠ হতে না হতেই তাই দেবী

গায়ে পরে নেয় পুরাণের আলোয়ান

চোখে এঁটে নিয়ে সাদা-কালো শ্রেণী-চশমা

ডানা দু’টো কেটে গার্বেজ ক্যানে ফ্যালে।

 

আসবে পতিত-পাবন, দেবী জানে। আসবে ত্রাতা, আসবে শ্রোতা, রাজা ও ভিখারি, দেব ও দানো।

 

অথচ আমরা দেখি, হাওয়ার ঝড়ে-মেঘে তার একটি পালকও উন্মীলিত হয় না।

 

দেবীদের জাগরূক হতে নেই।

 

 

 

The Dancer and the Snake (নৃত্যের বহির্ভূত সাপ)

নৃত্যের বহির্ভূত সাপ কেন্দ্রে ফণা তোলে;
বিষ জেনেও নওল নর্তকী
নাচের ঘেরে ফোটায় নতুন ফুল-
তার অক্লান্ত ঘূর্ণিতে বাঁচে যে অক্ষয় বট
পাতার আওয়াজে তার সাপটি পুনরায় বিচলিত হয়ে পড়ে:
অথচ-
পলাতক বাজের নখর আজ তারই মুখে অভিন্ন অসংশয়;
পরিধি থেকে কেন্দ্রে একাগ্র গতি, নাচে পড়লেও
পড়তে পারে যতি-
সতর্ক জিভে খোঁজে হাওয়ার ইঙ্গিত
———-

একটি আষাঢ়ে গল্প (মূল: ও’ হেনরি)

অস্টিনের দক্ষিণে একসময় বাস করত স্মদারস নামে এক গেরস্ত পরিবার। পরিবারে ছিল জন স্মদারস, তার স্ত্রী, পাঁচ বছরের এক ছোট্ট মেয়ে ও তার বাবা-মা। মোটের ওপর ধরলে পরিবারটি শহরের জনসংখ্যায় ছ’ জন মানুষ যুক্ত করে, যদিও এই গল্পের চরিত্রসংখ্যা মূলত তিন।

এক রাতে খাবার পর ছোট্ট মেয়েটার প্রচন্ড পেটব্যাথা শুরু হলে জন স্মদারস তড়িঘরি করে বেরিয়ে গেল ওষুধ আনতে।

আর ফিরে এল না।

ছোট্ট মেয়েটির অসুখ ভাল হয়ে গেল। সময়ের সাথে সে-ও বড় হতে লাগল।

মেয়েটির মা স্বামীর অন্তর্ধানে বেশ কাতর হয়ে পড়ল, তারপর প্রায় তিন মাসের মধ্যেই আরেকটা বিয়ে থা করে চলে গেল সান আন্তোনিওতে।

মেয়েটিও সময় এলে বিয়ে করল এবং কয়েক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তার নিজের মেয়ের বয়সই হয়ে দাঁড়াল পাঁচ বছর।

মেয়েটি এখনও যে বাড়িতে থাকা কালে তার বাবা চলে গিয়েছিল, আর ফিরে আসেনি, সেখানেই বসবাস করে।

এক রাতে এক আশ্চর্য্য কাকতালে তার ছোট্ট মেয়েটির প্রবল পেটপীড়া শুরু হল জন স্মদারসের তিরোধান-বার্ষিকীতে। খেয়ে-পড়ে বেচে থাকলে তিনি এতদিনে দাদুভাইয়ে পরিণত হতেন।

“আমি শহরে যাচ্ছি ওষুধ আনতে,” বলল জন স্মিথ (মেয়েটির স্বামীর নামও তাই কি না)।

“না, না, জন,” আতংকে চিৎকার করে ওঠে তার স্ত্রী। “তুমিও হারিয়ে যাবে শেষে, আর কোনদিন ফিরে আসবে না।”

তো জন স্মিথ আর গেল না, দুজনে মিলে ছোট্ট প্যান্সির শিয়রে বসে রইল (ওটাই প্যান্সির নাম ছিল)।

কিছুক্ষণ পর প্যান্সির অবস্থা আবারও খারাপ হলে জন স্মিথ ফের ওষুধ আনতে যাবার উদ্যোগ নিল। কিন্তু তার স্ত্রী তাকে কিছুতেই যেতে দিতে রাজি নয়।

সহসা দরজাটা খুলে গেল এবং বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, সাদা-চুলো এক বৃদ্ধ ঘরে প্রবেশ করল।

“এই ত দাদু এসে গেছে,” বলে উঠল প্যান্সি। সবার আগে সে-ই আগন্তুককে চিনে ফেলেছে। বৃদ্ধটি তার পকেট থেকে ওষুধের একটা শিশি বের করে প্যান্সিকে এক চামচ খাইয়ে দিল।

মেয়েটি সাথে সাথে ভাল হয়ে উঠল।

“স্ট্রিটকারের অপেক্ষায়,” বলল জন স্মদারস, “একটু দেরি হয়ে গেল”।

 

 

দশটি কবিতা (সূনৃত-তে প্রকাশিত)

আলোকপাত

অযথা জলাশয়ে ঢেউ কিংবাjanala
সাগরে থিরতা খুঁজে
থিতু হলে নিঃসীম প্রাকৃত অন্ধকারে-
রৌদ্রের বিপরীতে দুষলে কালঝড় আর
সবুজ ঘাসের বিপরীতে দাবানল।
এ খেলা চলতে পারে অবধিহীন।

ক্ষুধার চেয়েও সহজাত এ বৈপরত্য,
পরমানুর আবেগে সিঞ্চিত যে অস্থিরতা
ঘোচাবে কি করে এলোপাথারে মাথা ঠুকে।
কাল তাই তাকাবে সুদূরে।
যে প্রস্তর-লিখন চেছে তুলেছিলে দেবতার প্রণোদনায়
অস্পষ্ট রেখায় তার বোলাবে করুণ হাসি,
আলোকপাতে-
মানুষের নয় হবার শান্তি-পারঙ্গম।

 

নিঝুম দ্বীপ

এমন দৃশ্য কেউ দেখেনি কখনও।
ওষ্ঠাধরের বিচ্ছেদ স্পষ্ট
সমুখে স্বর্গ, চোখে লাগে ঘোর
সভ্যতার ইতিহাস থমকে দাঁড়ায় এখানে Continue reading “দশটি কবিতা (সূনৃত-তে প্রকাশিত)”

এটি কোন কবিতা নয়/ This Is Not A Poem

(এটা যখন লিখি প্রতিকবিতার নামটাও জানা ছিল না। তবে এটা সে অর্থে হয়ত প্রতিকবিতা নয়ও। নামটা তবুও অন্যথা বলে। প্রথমে ইংরেজিতে লেখা হয়েছিল। পরে কি ভেবে বাংলা করে ফেলি দ্রুত।)

এটি কোন কবিতা নয়। তবু কাব্য আমাকে স্মরণ করে এ প্রলাপ লেখার ক্ষণে। এবং তা লিখিত হয় আমার শোণিতে। আমি শুধু সাবধানে, খুব সাবধানে আমার মাথার সামনটা চিরে ফেলি। Continue reading “এটি কোন কবিতা নয়/ This Is Not A Poem”

স্ফুলিঙ্গ চতুষ্টয়


কিন্তু তারপর সব ঘাস হয়ে গেল
ঘ্যাসঘ্যাসে লোহা, আর তামাদি ফোস্কাবৎ আধান্যাংটা ঘোড়া —
সোজাসাপ্টা আলোয় তা বেমালুম উদয় হলো —
যদিও ততটা নির্ভার স্বর্ণপ্রভায় নয়, যেমনটা তুমি চেয়েছিলে,
নিছক এক তাপ—বৈদ্যুতিক খেলাচ্ছলে
উড়ে গেল শতদলে মৃতপাখা তুরন্ত শেল, বিনা লক্ষ্যভেদে।

বিনামেঘে বজ্রপাত, ঘাস থেকে বেরোল হঠাৎ শ্বেতশুভ্র ডিম —
হয়তো-বা থাকলে থাকতেও পারে নবোপলব্ধির সুরভিত কুসুম।


আমাদের হুটোপুটি, যন্ত্রণা,
ফ্যাঁসফোঁস, ক্যাঁচক্যাঁচ, প্যাঁকপ্যাঁক —
সব এক-লহমায় গপ করে গিলে নিয়ে
তিমিটা হারিয়ে গিয়ে কৃষ্ণগহ্বরে
কে জানে ফের উদয় হবে কোন মৃত সাগরের বুকে,
উগড়ে দিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড হাপুস জলোচ্ছ্বাসে।

সেখানে লুটোপুটি, ঘোঁতঘোঁত লারেলাপ্পা নিয়ে বয়ে যাবে
নীহারিকা যেন অঝোর স্মিত বেদুইন;
ধড়মুণ্ডহীন আবহমান অজগর।


ভোর এগিয়ে আসে
ভোরের মদালস বক্ষ চিরে উঁকি দেয়
কালোবিবর —
ভোরের শরীর বেয়ে নিকষ রক্তের ধারা  —
আচমকা মেঘ, ভাস্কর্যের ছাই-মুখ
ঝলসে ওঠে ছুরিকা-হাতে।

লাইটপোস্টগুলো ঠোঁটে তর্জনী চেপে
হলুদে-ভেজা ভ্যানগাড়িগুলোকে শাসালে
কড়কড়ে বিদঘুটে আওয়াজে
দিগন্ত আলোকিত করে ডাকে
একটা রূপালি সাইরেন
তার ধবল শব্দে শিরা-উপশিরা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট —
উহ্, কী পোড়া গন্ধ
রক্তাক্ত লাল ফুলের গুচ্ছ হয়ে
মাটিতে সজোরে আছড়ে পড়ে
ছুরিকাহত ভোর।

তারপর অসীম বিস্ফোরণের বিচ্ছুরণে
আমাদের আর হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।


বর্ষণের ভেতরে যে ক্ষোভ লুকিয়ে আছে
তাকে মুষ্টিবদ্ধ করো —
খাপখোলা তরবারির মতো বেজে উঠুক
তার হিমনাদ, পঙ্কিল পিপাসার
ভেতর সে সাড়া দিক,
ছিটকে বেরিয়ে আসুক, ফিরিয়ে দিক
আভা অধিকৃতদের নিভন্ত স্বরে

তাকে জাপ্টে ধরো,
ছুটে যেতে যেতে খামচে ধরো তার
আস্তিন, টুঁটি চেপে ধরো তার,
জোর আলিঙ্গন করো, বুকে পিষে
শুষে নাও তার অস্থির তরঙ্গাদি —
হরেক রঙের বেহায়াপনা তার চূর্ণ করো

যতক্ষণ না
যতক্ষণ না তার
সমস্ত ভাষাটুকু ফিরে পেয়েছ,
উপলব্ধি করেছ তার সংহারি বর্ণমালা

বর্ষণের ভেতরে যে ক্ষোভ ঘুমিয়ে আছে
তাকে ভালবাসো, আত্মস্থ করো আবার
পুনর্জন্ম নাও, তার আত্মজা হয়ে।

———