দেবী প্রসঙ্গে

12238359_10153327965626973_4755189591216612547_oমাথায় গুরুভার মুকুট- কিংবা হালফ্যাশনের বস্ত্রনিপাট- দেবী। কি করে, কে বানায়, আর কে হয়- কি পাপে কিংবা পাপের প্রায়শ্চিত্তে।

ভালবেসে মালা পড়ালে যদি- দেবী সে, কখনো বেশ্যা নয়। কখনো খেলাপী নয়- অথচ প্রস্তরের পাল্পলিপি জানে অন্তরীয় সংশয়।

এন্তার গীতিকাব্য হল লেখা। গল্প-গান-ভালবাসার উতকৃষ্টতম অর্ঘ্য অর্পিত হল যে পায়ে- তার নখরে লুকিয়ে থাকা সবুজ শ্যাওলা; যে মালা জড়ালে বাহু বেঁধে গলে গলে, সে কন্ঠের ফাঁস, থাকল অলখেই।

দেবীরা বড় শূণ্যে শূণ্যে চলে,

পায়ের পাতা ছোঁয় না মাটি মোটে

দেবীরা বড্ড বেছে বেছে কথা বলে

পাছে বদ লোকে কথাটা পেঁচিয়ে ফ্যালে!

পৃথিবীর চির-রহস্যের আধার- দেবী।

এই ললাট-লিখন খন্ডায় সাধ্য কার?

দূর্গ বিনা অচল সে নন্দিনী

প্রাচীরে ফাটল ধরাবে রাজকুমার!

 

হ্যাঁ, দেবীরা খুবই উদ্ধারকামী। স্বয়ম্ভূ হলেও তার বাহন চাই, হাতিয়ার প্রস্তুত থাকলেও তার শ্রমীক আবশ্যক। আর খুব করে, খুব-খুব করে, আরাধনা চাই!

দেবীরা খুব আরাধ্য না হলে প’রে

পুরোহিতেরা সব পেটে-ভাতে মরে

গল্প-কেচ্ছা-দালানের গা খসে-খসে

ইতিহাস-গড়া প্রতীমাটি ভেঙে পড়ে

ভূমিষ্ঠ হতে না হতেই তাই দেবী

গায়ে পরে নেয় পুরাণের আলোয়ান

চোখে এঁটে নিয়ে সাদা-কালো শ্রেণী-চশমা

ডানা দু’টো কেটে গার্বেজ ক্যানে ফ্যালে।

 

আসবে পতিত-পাবন, দেবী জানে। আসবে ত্রাতা, আসবে শ্রোতা, রাজা ও ভিখারি, দেব ও দানো।

 

অথচ আমরা দেখি, হাওয়ার ঝড়ে-মেঘে তার একটি পালকও উন্মীলিত হয় না।

 

দেবীদের জাগরূক হতে নেই।

 

 

 

একটি আষাঢ়ে গল্প (মূল: ও’ হেনরি)

অস্টিনের দক্ষিণে একসময় বাস করত স্মদারস নামে এক গেরস্ত পরিবার। পরিবারে ছিল জন স্মদারস, তার স্ত্রী, পাঁচ বছরের এক ছোট্ট মেয়ে ও তার বাবা-মা। মোটের ওপর ধরলে পরিবারটি শহরের জনসংখ্যায় ছ’ জন মানুষ যুক্ত করে, যদিও এই গল্পের চরিত্রসংখ্যা মূলত তিন।

এক রাতে খাবার পর ছোট্ট মেয়েটার প্রচন্ড পেটব্যাথা শুরু হলে জন স্মদারস তড়িঘরি করে বেরিয়ে গেল ওষুধ আনতে।

আর ফিরে এল না।

ছোট্ট মেয়েটির অসুখ ভাল হয়ে গেল। সময়ের সাথে সে-ও বড় হতে লাগল।

মেয়েটির মা স্বামীর অন্তর্ধানে বেশ কাতর হয়ে পড়ল, তারপর প্রায় তিন মাসের মধ্যেই আরেকটা বিয়ে থা করে চলে গেল সান আন্তোনিওতে।

মেয়েটিও সময় এলে বিয়ে করল এবং কয়েক বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তার নিজের মেয়ের বয়সই হয়ে দাঁড়াল পাঁচ বছর।

মেয়েটি এখনও যে বাড়িতে থাকা কালে তার বাবা চলে গিয়েছিল, আর ফিরে আসেনি, সেখানেই বসবাস করে।

এক রাতে এক আশ্চর্য্য কাকতালে তার ছোট্ট মেয়েটির প্রবল পেটপীড়া শুরু হল জন স্মদারসের তিরোধান-বার্ষিকীতে। খেয়ে-পড়ে বেচে থাকলে তিনি এতদিনে দাদুভাইয়ে পরিণত হতেন।

“আমি শহরে যাচ্ছি ওষুধ আনতে,” বলল জন স্মিথ (মেয়েটির স্বামীর নামও তাই কি না)।

“না, না, জন,” আতংকে চিৎকার করে ওঠে তার স্ত্রী। “তুমিও হারিয়ে যাবে শেষে, আর কোনদিন ফিরে আসবে না।”

তো জন স্মিথ আর গেল না, দুজনে মিলে ছোট্ট প্যান্সির শিয়রে বসে রইল (ওটাই প্যান্সির নাম ছিল)।

কিছুক্ষণ পর প্যান্সির অবস্থা আবারও খারাপ হলে জন স্মিথ ফের ওষুধ আনতে যাবার উদ্যোগ নিল। কিন্তু তার স্ত্রী তাকে কিছুতেই যেতে দিতে রাজি নয়।

সহসা দরজাটা খুলে গেল এবং বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, সাদা-চুলো এক বৃদ্ধ ঘরে প্রবেশ করল।

“এই ত দাদু এসে গেছে,” বলে উঠল প্যান্সি। সবার আগে সে-ই আগন্তুককে চিনে ফেলেছে। বৃদ্ধটি তার পকেট থেকে ওষুধের একটা শিশি বের করে প্যান্সিকে এক চামচ খাইয়ে দিল।

মেয়েটি সাথে সাথে ভাল হয়ে উঠল।

“স্ট্রিটকারের অপেক্ষায়,” বলল জন স্মদারস, “একটু দেরি হয়ে গেল”।

 

 

গোর্কির ‘মা’- একবিংশ শতাব্দীর পাঠ

অবশেষে ‘মা’ শেষ করলাম।

পুষ্পময়ী বসুকে প্রণাম, তার কারণেই বইটা যথাযোগ্য ভাবে উপভোগ করা গেল।  এত প্রাঞ্জল, সৃজনশীল আর আন্তরিক অনুবাদ ইহজীবনে পড়েছি বলে মনে পড়ে না। ভদ্রমহিলা মন-প্রাণ ঢেলে অনুবাদটি করেছিলেন, বোঝাই যায়।

একবিংশ শতাব্দীতে ‘মা’ এর পাঠ নি:সন্দেহে অন্যতর হবে। মা এমন সময়ে গোর্কি লিখেছিলেন যখন সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন সাধারণের মনে দানা বাধছে। মানুষের মাঝে সমতার বিধানের মাধ্যমে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে মশগুল এক দল তাজা তরুণ প্রাণ, যাদের আহবায়ক ও নেতৃত্বপ্রদানকারী স্বত্বা পাভেল, উপান্যাসের শিরোনাম্নী চরিত্র পাভেলেরই মা। প্রাথমিকভাবে ধর্মভীরু, কোমল মা নিজের অজান্তেই ধীরে ধীরে মিশে যায় ছেলের মিশনের সাথে, সত্য ও ন্যায়ের এক পৃথিবী প্রতিষ্ঠার কর্মযজ্ঞে। ওদের চোখের জ্বলে ওঠা আগুনের সাথে একাত্মা হয়ে ওঠে মা, শুরু হয় তার নতুন জীবন।

Continue reading “গোর্কির ‘মা’- একবিংশ শতাব্দীর পাঠ”