রাসোমনে ‘মনুষ্যত্ব’ : আকুতাগাওয়ার সংকট কুরোশাওয়ায় উত্তরণ

১৯৫১ সালে যখন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ‘রাসোমন’ কে মনোনীত করা হয়, তখন খোদ জাপানের কেউই ভাবেনি ছবিটি নিরংকুশ জয় লাভ করবে প্রথম স্থান অধিকার করে। রাসোমনের এই জয় ছিল বিস্ময়কর, এই বিজয় ছিল পশ্চিমাদের এশিয় চলচ্চিত্রকে নতুনভাবে ‘আবিষ্কারের’ বার্তাবহ। রাসোমন আরও বুঝিয়ে দিয়েছিল নিজ সংস্কৃতি ও ইতিহাসের শক্ত ভিতে ভর রেখেই চলচ্চিত্রের ভাষার পূর্ণ ব্যবহার করে চলচ্চিত্র জগতে নতুন কিছু সংযোজনের অপার সম্ভাবনায় ঋব্ধ জাপানসহ মহাদেশের অন্যান্য দেশগুলো। চোখ খুলে দিয়েছিল রাসোমন সবার; কিন্তু তার মহিমা কি শুধু কারিগরি ও চলচ্চিত্র ভাষার মুন্সিয়ানায় সীমাবদ্ধ? পশ্চিমা বিশ্বের কাছে এবং বর্তমান যুগে বোধ করি সমগ্র পৃথিবীতেই ‘রাসোমন’ আজ পরিচিত ধ্রুপদী সিনেমা হিসেবে। যুগে যুগে রাসোমন বিস্মিত, আন্দোলিত করে চলেছে দর্শক-বোদ্ধাদের মন ও মনন, প্রভাবিত করেছে প্রজন্মান্তরের চিত্র-পরিচালকদের। কিন্তু কি আসলে এই ‘রাসোমন’, কোথায় তার মূল বিশেষত্ব? সিনেমা হিসেবে তার কৃতিত্ব কোথায়, কোন যাদুমন্ত্রেই বা তা হয়ে ওঠে আকিরা কুরোশাওয়ার মাস্টারপিস?

r-4

রাসোমনের ইন্দ্রজাল ভেদ করতে হলে যেতে হবে প্রথমে এর উৎসে- রিউনোসুকে আকুতাগাওয়ার গল্পদ্বয় ‘রাসোমন’ ও ‘বাঁশবনে খুন’- জাপানি সাহিত্যের দুই অনবদ্য সৃষ্টি যা থেকে উৎসারিত হয় কুরোশাওয়ার এই মাস্টারপিস। সত্য ও ন্যায়ের আপেক্ষিকতা, সর্বোপরি মনুষ্যত্বকে আকুতাগাওয়ার সাহিত্যে যে সংকটে পতিত হতে দেখা যায়, মহত্তম পরিচালক কুরোশাওয়ার একই গল্পের ভিত্তিতে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘রাসোমন’-এ আমরা দেখি এক পরিপূর্ণ রূপ পেতে। মনুষ্যমনের জটিলতায়, নৈতিকতার প্রশ্নে কুরোশাওয়া কেবল আলো ফেলেই ক্ষান্ত হন না, বরং তার প্রচ্ছন্ন কারণগুলোকে চলচ্চিত্রের ভাষায় ব্যক্ত করতে সচেষ্ট হন। ছবিটির শেষে কুরোশাওয়ার বহুল আলোচিত যে সংযোজন (কাঠুরের পরিত্যক্ত শিশুটিকে গ্রহণ) ও নারী চরিত্রটির ব্যাপকতর উপস্থাপন সিনেমা হিসেবে যেমন, শিল্পের মাপকাঠিতেও ছাড়িয়ে যাবার উপক্রম করে মূল গল্পকে। শিল্প হিসেবে ও সংকট উত্তরণের প্রশ্নে সিনেমাটির সাফল্য পরিষ্কার হয়ে উঠতে পারে সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মূল্যায়নে- যা এই রচনাটির মূল উপজীব্য।

রাসোমন ও কুরোশাওয়া

জাপানের চলচ্চিত্র জগতের ‘সম্রাট-’খ্যাত পরিচালক আকিরা কুরোশাওয়া যখন ‘রাসোমন’ বানানোর কাজে হাত দেন তখনও তিনি ‘সম্রাট’ হয়ে ওঠেননি। ‘রাসোমন’ এর প্রযোজক সংস্থা দাইয়েই প্রথম থেকেই সন্দিহান ছিল কাজটা নিয়ে, ফিল্মটির সহকারী পরিচালকেরা চিত্রনাট্য পড়েও বুঝতে পারেননি প্রথমে রাসোমনের ধাঁধা। আসলে রাসোমনের যে গল্পটি তা সাধারণভাবেই যে কোন মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট- একটি খুনের ও ধর্ষনের সাক্ষীদের বিবৃতি যা একটা আরেকটার সাথে কোনভাবেই মেলে না। এমন একটি দুর্বোধ্য গল্প নিয়ে সিনেমা বানানোর দুঃসাহসই শুধু কুরোশাওয়া দেখান না, রাসোমনের ধাঁধার এক মানবিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে শিল্পী হিসেবে নিজস্ব একটা আশ্বাস ও আস্থাও দর্শকের মাঝে পুনঃস্থাপন করেন।

পরিচালক হিসেবে কুরোশাওয়া বিশেষভাবে পরিচিত তার গভীর মানবতাবোধ ও নৈতিকতা নিয়ে তার প্রবল আগ্রহের জন্য। ব্যক্তিমানুষের বস্তুনিষ্ঠ চরিত্রায়ন তার ছবিতে প্রাধান্য পায়, তৎকালীন জাপানী চিন্তাধারার ক্ষেত্রে যা ছিল অনেকাংশেই বিপ্লবী। তার ‘ইকিরু’, ‘হাই অ্যান্ড লো’, ‘সেভেন সামুরাই’ চলচ্চিত্রসমূহে চরিত্রগুলোর বস্তুনিষ্ঠ চরিত্রায়ন শুধু ব্যক্তি ও সমাজের পরস্পর সম্পর্ককেই নিরিখ করে না, মানবতা বা মনুষ্যত্ত্বের সীমারেখাকেও যেন পরখ করে দেখতে চায় মানবিক শক্তি ও দুর্বলতারই মাপকাঠিতে। রাসোমনেও তার ব্যত্যয় ঘটে না। গল্পের খুন ও ধর্ষনের ঘটনা দেখাতে কুরোশাওয়া যে মস্তিষ্কভেদী বস্তুবাদী সংলাপের উন্মেষ ঘটান, মানুষের নৃশংসতা নির্মমতাকে তুলে ধরতে এতটুকু পিছপা হন না, তা কুরোশাওয়ার মর্মভেদী অন্তর্দৃষ্টিরই পরিচয় দেয়। কিন্তু সে বিষয়ে বিশদে যাবার আগে মূল গল্পে একটু ফিরে যাওয়া দরকার, যার নিরীক্ষণ কুরোশাওয়ার নিজস্বতা সম্বন্ধে আমাদের নিশ্চিত করে।

সাহিত্যে “রাসোমন” : আকুতাগাওয়ার অমিমাংসিত সংকট  

আগেই বলা হয়েছে রিউনোসুকে আকুতাগাওয়ার গল্প ‘রাসোমন’ ও ‘বাঁশবনে খুন’ অবলম্বনে আলোচ্য কুরোশাওয়ার ফিল্মটি নির্মিত। আকুতাগাওয়া ক্ষণজন্মা এক লেখক, বেঁচেছিলেন মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর। এই সীমিত সময়ের মধ্যে যা রচনা করে গেছেন তা জাপানী সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে আজ স্বীকৃত। যদিও আকুতাগাওয়ার জীবদ্দশায় তা হয়নি, হলে হয়ত আত্মহননের পথ বেছে নিতে নিতেন না।

আকুতাগাওয়ার অধিকাংশ গল্পই ইতিহাসের ঘটনা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট প্রভাবিত, যদিও চরিত্রগুলো নতুন চেহারা পায় আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের গুনে। তার গল্প ‘রাসোমন’ কিয়োতোর ঐতিহাসিক রাসোমন তোরণের প্রেক্ষাপটে সাজিয়েছে এক সদ্য-বেকার সামুরাইয়ের প্রবল ঝড়-বৃষ্টির রাতে নৈতিক অধঃপতনের চিত্র। এই গল্প থেকে মূলত কুরোশাওয়া ‘রাসোমন’ ফিল্মের আবহাওয়াটুকু নেন। সিনেমা ‘রাসোমন’ও তাই রাসোমন গল্পের মতই শুরু হয় প্রবল দুর্যোগের ঘনঘটায়। সে যেন মানুষের ডেকে আনা ভয়াবহতম দুর্যোগ, ধরাধামের উপর্যুপরি বিনাশের বার্তাবাহী। রাসোমনের ধ্বংসস্তূপ, ক্ষয়িষ্ণু এক সময় যখন খুন, রাহাজানি, লুটপাট নিত্যকার ঘটনা- এর সবকিছুর সাথে মিশে যায় এই মুশলধার বৃষ্টি। এমন ঝড়বৃষ্টিতে ভেঙে পড়া জীর্ণ রাসোমন তোরণে শুরু হয় তিন জনের কথপোকথন- কাঠুরে, বৌদ্ধ পরিব্রাজক ও এক সাধারণ লোকের, বিষয়বস্তু “বাঁশবনে খুন”। এর মধ্যে প্রথম দু’জন ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শী ও মামলার সাক্ষী। কথপোকথনের এই পুরো অংশটুকুই কুরোশাওয়ার নিজস্ব সংযোজন, এর মধ্যে তিনি শেষে কাঙ্ক্ষিত উপসংহারে পৌঁছান।

মূল “বাঁশবনে খুন” গল্পে আকুতাগাওয়া একটি খুন ও ধর্ষণের ঘটনাকে তুলে ধরেন মোট সাতজন ব্যক্তির জবানবন্দিতে। এর মধ্যে মুখ্য খুনী ব্যক্তি, ডাকাত তাজোমারু, ধর্ষিতা সামুরাইয়ের স্ত্রী মাসাগো, ও মৃত ব্যক্তি সামুরাই তাকেহিতো স্বয়ং। এমন প্রকরণকৌশলে গল্পটি হয়ে ওঠে একাধারে বস্তুনিষ্ঠ ও বস্তুনিরপেক্ষ। গল্পটি বস্তুনিষ্ঠতা পায় এ বলে যে, পুরো ঘটনাই উপস্থাপিত হচ্ছে কোন না কোন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। আবার, গল্পটি বস্তুনিরপেক্ষও বটে, কারণ পুরো গল্পে লেখক নিজের বলে একটি বাক্যও খরচ করেননি (যদিও মৃত ব্যক্তির বিবৃতি অনেকটাই লেখকের নিজস্ব মনোভাবকেও ব্যক্ত করে)।

ঘটনা এই যে, জঙ্গলের পথে সামুরাই তাকেহিতো তার স্ত্রীকে নিয়ে যাচ্ছিল গন্তব্যে। পথে কুখ্যাত ডাকাত তাজোমারুর চোখ পড়ে সুন্দরী মাসাগোর উপর। লোভের বশে তাকেহিতো ব্যর্থ হয় স্ত্রীকে রক্ষা করতে, ধর্ষিত হয় মাসাগো তাজোমারুর কাছে। এর পরের ঘটনা অস্পষ্ট, তবে এরই জের ধরে মারা যায় তাকেহিতো, যার লাশ খুঁজে পায় এক কাঠুরে। মাঝখানের এই ধোঁয়াশাতেই হাতড়ে ফিরতে হয় উত্তর, কিন্তু যা মেলে আকুতাগাওয়ার গল্পের শেষে তা যেন এক ধাঁধা, এক বিশাল শূণ্যতা- কারণ লুটেরা, সামুরাই এর স্ত্রী, সামুরাই- তিনজনেই নিজেদের খুনী বলে সাক্ষ্য দেয়।

আকুতাগাওয়া গল্প এখানেই শেষ করে দেন, মৃতের জবানবন্দিতে। আপাতদৃষ্টিতে, তার কাছে মৃতের মতামতই চূড়ান্ত। কিন্তু সত্য অনুসন্ধানে কুরোশাওয়া যেন এক কাঠি বাড়া, মৃতকেও অস্বীকার করে তিনি সাজিয়ে নেন এক নতুন সত্য যা মানবতাকে এক নতুন দিশায় পুনরুজ্জীবিত করে।

চার জবানবন্দি ও আরো

গল্পের কাঠুরে, বৌদ্ধ পাদ্রী, তাজোমারু (ডাকাত), মাসাগো ও সামুরাই এর জবানবন্দিকে প্রায় হুবহুই তুলে আনেন সিনেমায় কুরোশাওয়া। জবানবন্দি গুলো সংক্ষেপে জেনে নেয়া যাক।

কাঠুরের জবানবন্দিঃ আকুতাগাওয়ার গল্প শুরু হয় কাঠুরের সাক্ষ্য দিয়ে- বনের মধ্যে সামুরাইয়ের লাশ সে-ই আবিষ্কার করে। মূল গল্পে কাঠুরের ভূমিকা এই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, কিন্তু সিনেমায় কুরোশাওয়া কাঠুরের ভূমিকাকে আরো অনেকটা বিস্তৃত করে কাহিনীকে একটা পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রদানের চেষ্টা করেন। সিনেমাতে কাঠুরে শুধু লাশটিকে খুঁজেই পায় না, পুরো ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করে হয়ে ওঠে সাক্ষ্য বহনকারী তৃতীয় পুরুষ। এই তৃতীয় পুরুষের ভাষ্যেই (প্রায়) জীবন্ত হয়ে ওঠে সত্য ঘটনাটি, যেখানে নারীটির ভূমিকা তার সকল দ্ব্যর্থবোধক ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়। যেহেতু মূল গল্পে চূড়ান্ত মিমাংসা টানার মোটে কোন চেষ্টা করা হয় না, সিনেমার এই বাড়তি সংযোজনকে একটা সম্ভাব্য মীমাংসা উপস্থাপন করতে কুরোশাওয়ার প্রয়াস বলতে দ্বিধা নেই।

r-2r-1

কাঠুরের জংগলে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার এই সিকোয়েন্সটি ফিল্মের ইতিহাসে সবচেয়ে নান্দনিক লং টেকগুলোর একটি বলে স্বীকৃত। কুরোশাওয়া অবশ্য এর কৃতিত্ব অনেকটাই তার সিনেমাটোগ্রাফার মিয়াগাওয়াকে দিয়েছেন, সরাসরি সূর্যে ক্যামেরা তাক করে শ্যুট করার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত তাঁরই ছিল।

বৌদ্ধ পরিব্রাজকঃ দ্বিতীয় সাক্ষ্যটি বৌদ্ধ পরিব্রাজকের, রাশোমনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ক্যামেরা ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায় জবানবন্দিতে। পরিব্রাজক জবান পেশ করেন, কিভাবে, বনের পথে তার দেখা হয় সামুরাই তাকেহিতো ও ঘোড়সওয়ার পর্দাবৃতা তার স্ত্রীর সাথে। সবগুলো জবানবন্দির মত এখানেও subjective camera বা POV angle এর প্রয়োগ করা হয়। প্রত্যেক সাক্ষীকে ক্যামেরা ঠিক মুখোমুখি বসানো হয়, এ থেকে দর্শকই যে কুরোশাওয়ার কাছে প্রধান বিচারক তাই বোঝা যায়।

পুলিশ কনস্টেবলঃ তৃতীয় সাক্ষ্যটি সেই পুলিশ কনস্টেবলের যে তাজোমারুকে হাতে নাতে গ্রেপ্তার করে। পুলিশটি তাকে খুজে পায় নদীর ধারে ধরাশায়ী অবস্থায়।

ডাকাত তাজোমারুঃ তাজোমারুর চরিত্রে তোশিরো মিফুনের কাজ ছবিটির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি বলে ধরা যায়। মূল গল্পে যেমন, তাজোমারু সম্পূর্ণ সত্য বলার অঙ্গিকার করে বলে কিভাবে প্রথম বনে তার সাথে সাক্ষাৎ হয় সামুরাই ও মেয়েটির। ক্যামেরা ডিরেক্ট কাটে চলে যায় ফ্ল্যাশব্যাকে। জবানবন্দির মত ফ্ল্যাশব্যাকগুলোও subjective। অর্থাৎ সত্য/ বাস্তবতা চিন্তা-প্রক্রিয়া, এমনকি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়াটিই ব্যক্তিনির্ভর। ফিল্মের এই টেকনিক অত্যন্ত কার্যকরভাবে কুরোশাওয়ার বক্তব্যকে তুলে ধরে সেলুলয়েডের ভাষায়। কিন্তু সত্য ও বাস্তবতা চূড়ান্তভাবে আপেক্ষিক- আকুতাগাওয়ার মত কুরোশাওয়ার বক্তব্য এখানেই শেষ নয়।

মাসাগোঃ ডাকাতের পরে মেয়েটির জবানবন্দী শুরু হয়। মেয়েটির ভাষ্যে, ধর্ষণের পরে সে স্বামীর কাছে ছুটে গেলে ঘৃণার শীতল দৃষ্টি। একাধিক ফুল ফ্রেম ক্লোজ শটে দর্শকও সেই ঘৃণা চাক্ষুষ করতে পারে, দেখতে পারে মাসাগোর দৃষ্টিতে তার স্বামীর রূপান্তর। মাসাগোর ভাষ্যমতে সে তার স্বামীকে ছোরা দিয়ে আঘাত ক্রএ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কুরোশাওয়া যেখানে মেয়েটির অভিজ্ঞতাকে এক নতুন বিচিত্র আলোয় তুলে ধরতে চান, আকুতাগাওয়ার দৃষ্টিভংগি সেখানে অনেকটাই সাদা-কালো।

মৃত ব্যক্তি (তাকেহিতো): মৃত ব্যক্তির কাহিনী বলা হয় সিনেমাতে এক মিডিয়ামের মাধ্যমে। মৃতের সংস্করণে বউ ডাকাতকে বলে তাকে মেরে ফেলবার জন্য। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ডাকাত ও সামুরাই দু’জনই মেয়েটিকে মেরে ফেলবার উদ্যোগ নিলেও মাসাগো পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তাকেহিতোর ভাষ্যমতে অন্য কেউ নয়, নিজেরই ছুরিকাহাতে আর মৃত্যু ঘটে। কিন্তু গল্পের শেষের যে ছেঁড়া সুতোটি, আত্মহত্যার পরে কারো মৃতের বুক থেকে ছুরি সরিয়ে নেওয়া- এরই জের ধরে কুরোশাওয়া নিয়ে আসেন কাঠুরের স্বীকারোক্তি, নিজস্ব কায়দায় জোড়া দিতে থাকেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধাঁধার খন্ড-খন্ড টুকরোগুলোকে।

কাঠুরের স্বীকারোক্তি (ধাঁধার হারানো খন্ড): কাঠুরের স্বীকৃতির এই অংশ কুরোশাওয়ার সম্পূর্ণ নিজস্ব সংযোজন, সুতরাং এর পাঠের মাধ্যমে তার রাশোমন নামক এই ধাঁধার এক অর্থ উদ্ধার করার প্রয়াসের স্বরূপ প্রকাশিত হয়। কাঠুরের বিবৃতিতে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে গল্পের দুই পুরুষের প্রকৃত কাপুরুষতা। তাকেহিতো-তাজোমারুর দীর্ঘ-বিলম্বিত, হাস্যকর সে তলোয়ার-যুদ্ধ, কুরোশাওয়া যেভাবে এক দীর্ঘ শটে ধারণ করেন- একটি উপর্যুপরি নিষ্ফল আস্ফালন ছাড়া আর কিছুই বোধ হয় না। এই ‘আস্ফালন’ তাজোমারুর বীরোচিত তলোয়ার কসরত আর তাকেহিতোর নারীদ্বেষী বিবৃতির অসংলগ্নতাকে তুলে ধরে তাতপর্যপূর্ণভাবে।

কাঠুরের বিবৃতির মাধ্যমে কুরোশাওয়া চরিত্রগুলোকে এক ধরনের বিনির্মাণ করেন। পুলিশ ও তার নিজের সাক্ষ্যে ডাকাত তাজোমারুর যে ভয়ানক ও বীরপ্রতাপ ইমেজ গঠিত হয়, কাঠুরের বর্ণনায় তা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। তাজোমারুর বিবৃতিতে মাসাগো অসহায় নারী, কাকুতি-মিনতি করে বারবার তাকে সাথে নেবার জন্য। ডাকাতের সাথে সামুরাইয়ের বিবৃতির বিশাল ফারাকের কারণ আর কিছুই নয়, তাজোমারুর পুরুষালী অহম।

শুধু ডাকাতের নয়, সামুরাই ও মাসাগোর চরিত্রেও নতুনভাবে দেখা যায় এই পর্বে। ছাড়া পেয়ে সামুরাই স্ত্রীকে গ্রহণ করতে নারাজ হলে মেয়েটির তাকে মেরে ফেলবার অস্বাভাবিক আর্জির ব্যাখ্যা যেমন এতে মেলে, তেমনি মেয়েটির গল্পের সেই ভয়াবহ ঘৃণার দৃষ্টির উৎসও খুঁজে পাওয়া যায়।  

কিন্তু কাঠুরের বিবৃতির সিকোয়েন্সটি উল্লেখযোগ্য আরকটি বিশেষ উপাদান যোগ করার কারণেঃ ডাকাত-মাসাগো-সামুরাইয়ের মধ্যকার ত্রিভুজ মিথষ্ক্রিয়া, ভিন্নভাবে বললে ভিন্নভাবে বললে মেয়েটির দুই পুরুষের পৌরষত্বে আঘাত হেনে পরস্পরে দ্বন্দ্বে লিপ্ত করবার দৃশ্যটি। সিকোয়েন্সটি তাতপর্যপূর্ণ দুটি কারণেঃ ১) মেয়েটির অপরাধবোধ ও ফলস্বরূপ খুনের দায়স্বীকারের একটি ব্যাখ্যা প্রদান করে। ২) নারীর জটিল মনোস্তত্ব (ও তার কারণে) কুরোশাওয়ার আলোকপাতের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।

r-3

গল্পে ও সিনেমায় বার-বার যে বিষয়টি উন্মোচিত হয় তা হচ্ছে নারীর সতীত্ব নিয়ে তৎকালীন জাপানের প্রচলিত সংস্কার- স্বামী ছাড়া অন্য কোন পুরুষের সাথে শারীরিকভাবে মিলিত হলে (স্বেচ্ছায় বা জোরপূর্বক) সে নারী স্লেচ্ছ, স্খলিতা। নারীর এমন অবস্থানই তাকে ফেলে দেয় উভয়সংকটে- তার ব্যতিক্রম হয় না মাসাগোও। ধর্ষিতা মাসাগো দৌড়ে স্বামীর বাঁধন কেটে দিলে ডাকাতের প্রশ্নের জবাবে তিক্ত উত্তর করে- “একটা মেয়ের কথার এখানে কি-ই বা মূল্য আছে?” পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নির্মমতা যেন মাসাগোর সেই তীর্যক বাক্যে, পাষাণ মুখচ্ছবিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।

কিন্তু মাসাগোর স্বামী প্রথমেই তার নষ্টা-ভ্রষ্টা স্ত্রীর জন্য লড়াইয়ে অস্বীকৃতি জানায়, অনাগ্রহী হয়ে ওঠে ডাকাতও। ধর্ষিতা নারীর সে করুণ পরিণতি ক্ষণিকের জন্য ফুটে ওঠে সেলুলয়েডে- ডাকাতের দু’ পায়ের ফাঁকে ধুলায় লুটায়িত মাসাগো, বামে একটু দূরে স্বামীর উন্নাসিক মুখ। ডাকাতের স্বান্তনাবাক্যে- “মেয়েরা স্বভাবতই দূর্বল হয়”- জ্বলে ওঠে মাসাগো, হেসে ওঠে পাগলের মত- “তোমরাই আসলে দূর্বল!” ছলনাময়ী নারীর রূপ নিয়ে দুই পুরুষের আঁতে ঘা দিয়ে ক্রমে লিপ্ত করে মরণপণ লড়াইয়ে। অর্থাৎ মাসাগোর চরিত্রটিও শান্ত নম্র জাপানি বউটির ভূমিকা থেকে বিনির্মিত হয় কুরোশাওয়ার সত্য অন্বেষণে।

একটি আদি-অন্তহীন ধাঁধা ও কুরোশাওয়ার সত্য অন্বেষণ

কিন্তু কোন সত্যই পরম নয়, কোন গল্প নয় নিখুঁত- ‘সত্যে’ নির্বিচার বিশ্বাস কুরোশাওয়া স্থাপন করতে চাননি। তাই ত অবতারণা করেন নতুন দৃশ্যপটের- রাশোমনে ধ্বনিত হয় নবজাতক শিশুর কান্না। তৃতীয় ব্যক্তি বাচ্চাটির গায়ের অলংকার খুলে নিতে কাঠুরে প্রতিবাদ জানালে প্রকাশিত হয়ে পড়ে নতুন সত্য- কাঠুরেই চুরি করেছিল মৃত ব্যক্তির রত্নখচিত ড্যাগার। সবার মত কাঠুরেও গল্পটি নিজের সুবিধানুযায়ী বলেছিল। ডাকাত নিজের অপরাধ স্বীকার করেও এক বীরোচিত কাহিনীর অবতারণা করে; মৃত ব্যক্তি সমস্ত দোষ স্ত্রী ও ডাকাতের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করে; , মেয়েটি নিজের সচ্চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে স্বামীর ঘৃণার দৃষ্টিতে তাল-জ্ঞান হারায় ও কাঠুরে কেবল থাকে নিরব দর্শক।

রাশোমনের সহকারী পরিচালকেরা যখন দ্বিধাগ্রস্থ মনে কুরোশাওয়ার শরণাপন্ন হন তখন তিনি এভাবেই ব্যাখ্যা করেন রাশোমনকে- “মানুষ চাইলেও নিজেদের সাথে নিজে সৎ হতে পারে না। তারা নিজেরা নিজেদের সম্পর্কে অলংকরণ ছাড়া কোন কথা বলতে পারে না। এই স্ক্রিপ্টে এমনই সব মানুষের কথা বলা আছে- যারা মিথ্যা ছাড়া বাঁচতে পারে না, এই অসত্যের মাঝেই ভাল মানুষ হিসেবে তারা নিজেদের খুঁজে পায়… অহম এমন এক অভিশাপ যা মানুষ জন্ম থেকে বহন করে চলেছে; এর থেকে নিষ্কৃতি পাবার উপায় নেই। এই সিনেমাকে বলতে পারো এক আজব পান্ডুলিপি, অহমই একে মেলে ধরে… মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার অসম্ভবতাকে যতটাই অনুধাবন করবে, তখনই বুঝতে পারবে এর প্রকৃত অর্থ।“

মানব মনস্তত্ত্বের জটিলতাকে স্বীকার করে নিয়েই কুরোশাওয়া রাশোমন নামের অন্ত-আদিহীন ধাঁধার এক বোধগম্য ব্যাখ্যা খুঁজে পাবার চেষ্টা করেন, যা প্রায় খাপে-খাপেই গল্পের ছেঁড়া সুতোকে জোড়া লাগাতে সক্ষম হয়। কিন্তু এ-ত গেল গল্পের ও সিনেমার আধেয়ের কথা দর্শনের দিকে থেকে কাজ দুটির মধ্যে কতটুকু তফাত থেকে যায়?

সাহিত্যের রাশোমনের দর্শন জটিল, কুহেলিকাপূর্ণ। গল্পে তিনজনই খুনের দাবিদার, একই ঘটনা তিন ভিন্ন বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা হয়। গল্পের বিভিন্ন বাঁক গুলো যেমন ভিন্নতর, তার চেয়েও ভিন্ন পরিণতিগুলো। এভাবে পাঠক অন্তিমে গিয়ে কোন সমাধান ত খুঁজে পানই না বরং শেষমেশ ‘সত্য’ সম্বন্ধেই সন্দিহান হয়ে পড়েন। সত্যের এই টলায়মান অবস্থান তাই আকুতাগাওয়ার বিশ্বদৃষ্টি ও প্রকারান্তরে গল্পশৈলীতেই নিহিত। আকুতাগাওয়ার এই বিশ্বদৃষ্টির পাঠ হতে পারে- যেখানে মানুষ আছে সেখানে প্রকৃত সত্য বলে কিছু নেই। কিন্তু এই চূড়ান্ত মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হুমকির মুখে পড়ে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নগুলো, কিংবা মনুষ্যত্ব স্বয়ং। পাদ্রীর কন্ঠেই প্রকট হয় এই সংকট- “এ ত ভয়ানক! মানুষ যদি পরস্পরকে বিশ্বাসই না করতে পারে তবে পৃথিবীটাই যে নরক হয়ে যাবে!” উত্তরে তৃতীয় ব্যক্তির মাঝে আশ্রয় নেয় আকুতাগাওয়া- “নরকই ত!”

সংকটের তীরে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকান কুরোশাওয়া- সত্যের প্রতিশ্রুতিবিহীন পৃথিবী নারকীয় হলে মনুষ্যত্বই বা টিকে থাকে কি করে? উত্তর মেলে ছবির শেষে, কাঠুরের শিশুটিকে দত্তক নেবার মাধ্যমে। অপরাধবোধে অনুতপ্ত হয়েই কিংবা মানবিক সহানুভূতিতে, কাঠুরের এই মহৎ কর্মই যেন পাদ্রী, এবং অবশেষে দর্শকদের মনে, নতুন আশার সঞ্চার করে। বাইরের দূর্যোগের ঘনঘটা স্তিমিত হয়, রাশোমনের ধ্বংসস্তূপের মাঝে হেঁটে যায় পরিতৃপ্ত মুখে কাঠুরে, কোলে তার আগামীর সম্ভাবনা নবজাতক মানবশিশু। হোক সে মানবশিশু আজন্ম অহমাক্রান্ত, দিনের শেষে তবু ওই হাজার ত্রুটিপূর্ণ মানবতাই থাকে তার শেষ সম্বল।

আকুতাগাওয়ার অবিশ্বাসকে এভাবেই বিশ্বাসে রূপান্তরিত করেন কুরোশাওয়া সেলুলয়েডের নান্দনিক ভাষ্যে। কুরোশাওয়ার জন্য মানুষের মানবতাতেই উত্তরণ সকল সংকটের, তার নির্মিত ‘রাশোমন’ও তাই গায় মানবতার জয়গান, সকল দুর্যোগ প্রশমন পরে।

 

 

—————-

 

 

সূত্রঃ

আকিরা কুরোশাওয়া, Something like an autobiography, ১৯৮১

ডোনাল্ড রিচি, The films of Akira Kurosawa, ১৯৯৯

ভিনসেন্ট লোব্রুত্তো, Becoming film literate, ২০০৫

বিধান রিবেরু, চলচ্চিত্র পাঠ সহায়িকা, ২০১১

(ম্যাজিক লন্ঠন, সংখ্যা ৭ এ প্রকাশিত)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s